বেইজিংয়ে এক বিশাল সামরিক কুচকাওয়াজে নতুন প্রজন্মের অস্ত্র, ড্রোন ও অন্যান্য সামরিক প্রযুক্তি উন্মোচন করেছে চীন। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রদর্শনী যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের উদ্দেশে এক স্পষ্ট বার্তা—চীন এখন কৌশলগত ও প্রযুক্তিগতভাবে আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রস্তুত।
তিয়ানআনমেন স্কোয়ারে অনুষ্ঠিত এই কুচকাওয়াজে উপস্থিত ছিলেন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংসহ রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন ও উত্তর কোরিয়ার কিম জং উনসহ ২০টিরও বেশি দেশের নেতা। এটি ছিল একদিকে শক্তির প্রদর্শন, অন্যদিকে কূটনৈতিক ঐক্যের প্রকাশ।
দ্রুত অগ্রগতি ও বৈচিত্র্যময় অস্ত্রভাণ্ডার
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন যে দ্রুত সামরিক উন্নতি করেছে, এই প্রদর্শনী তা স্পষ্ট করেছে। এক দশক আগেও তারা মার্কিন প্রযুক্তির অনুকরণে সীমাবদ্ধ ছিল; এখন নিজেদের উদ্ভাবনী অস্ত্রই তাদের গর্ব।
সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির সমর বিশ্লেষক ড. মাইকেল রাস্কা বলেন, “চীন এখন শুধু অনুকরণ নয়, উদ্ভাবনে মনোযোগ দিচ্ছে—বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তিতে।”
আলেকজান্ডার নীলের মতে, কেন্দ্রীয় কাঠামো ও বিপুল সম্পদের কারণে চীন দ্রুত উৎপাদন ও মোতায়েন—দুই ক্ষেত্রেই সুবিধাজনক অবস্থানে। তবে এসব প্রযুক্তিকে বাস্তব যুদ্ধে কার্যকরভাবে একীভূত করা চীনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরোধ কৌশলে নজর
চীনের সাম্প্রতিক উন্নয়নের মূল কেন্দ্র ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী। প্রদর্শনীতে দেখা গেছে ডংফেং-৬১, ডংফেং-৫সি ও ডংফেং-২৬ডি (“গুয়াম কিলার”)—যেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ড ও সামরিক ঘাঁটিতে আঘাত হানতে সক্ষম।
এছাড়া চীন প্রথমবারের মতো দেখিয়েছে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ওয়াইজে-১৭ ও ওয়াইজে-১৯, এবং পানির নিচে থেকে আঘাত হানতে সক্ষম স্বয়ংক্রিয় ড্রোন এজেএক্স-০০২।
এই সব অস্ত্রই যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর আধিপত্যে পাল্টা ভারসাম্য তৈরি করতে চীনের কৌশলগত পদক্ষেপের অংশ।
ড্রোন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় অগ্রগতি
চীনের ড্রোন প্রযুক্তিও এই কুচকাওয়াজের বড় আকর্ষণ ছিল। এজেএক্স-০০২ সাবমেরিন ড্রোন, জিজে-১১ স্টিলথ অ্যাটাক ড্রোন ও রোবোটিক ‘নেকড়ে ড্রোন’—সবই চীনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর যুদ্ধক্ষমতার প্রতীক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীন ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিয়ে ড্রোন ব্যবহারে কৌশলগত দক্ষতা অর্জন করেছে। ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে এআই-নির্ভর “ন্যানোসেকেন্ড সিদ্ধান্ত” গ্রহণের মাধ্যমে চীন দ্রুত আক্রমণ-প্রতিরোধ উভয় ক্ষেত্রেই এগিয়ে যেতে চায়।
প্রযুক্তিতে অগ্রগতি, কিন্তু অভিজ্ঞতায় পিছিয়ে
যদিও প্রযুক্তিগতভাবে চীন দ্রুত এগোচ্ছে, সামরিক অভিজ্ঞতার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখনো এগিয়ে।
ড. রাস্কা বলেন, “আমেরিকার যুদ্ধ সংস্কৃতি ও অভিজ্ঞতা তাদেরকে কৌশলগতভাবে এগিয়ে রেখেছে, যেখানে চীনা সেনাবাহিনী অনেক বেশি কেন্দ্রাভিমুখী ও কঠোর নির্দেশনায় পরিচালিত।”
চীনের মূল শক্তি প্রযুক্তি ও প্রতিরোধ সক্ষমতা; তবে বাস্তব যুদ্ধে সেই সক্ষমতা কতটা কার্যকর হবে, তা এখনো প্রশ্নসাপেক্ষ।
অস্ত্র বিক্রির কূটনৈতিক মঞ্চ
এই কুচকাওয়াজকে অনেকে চীনা অস্ত্র বিক্রির প্রদর্শনী হিসেবেও দেখছেন। দুই ডজনের বেশি বিদেশি রাষ্ট্রনেতার উপস্থিতিতে এটি ছিল সম্ভাব্য ক্রেতাদের আকর্ষণ করার সুবর্ণ সুযোগ। মিয়ানমারসহ কয়েকটি দেশ ইতিমধ্যেই চীনা অস্ত্রের বড় ক্রেতা।
পুতিন ও কিম জং উনের উপস্থিতি চীন-রাশিয়া-উত্তর কোরিয়ার ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্টের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি চীনকে মোকাবিলা করতে চায়, তবে তাকে একইসঙ্গে কোরীয় উপদ্বীপ, তাইওয়ান প্রণালী ও ইউক্রেনের মতো একাধিক ফ্রন্টে প্রস্তুত থাকতে হবে—যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও কঠিন একটি চ্যালেঞ্জ।
সারকথা, বেইজিংয়ের কুচকাওয়াজ শুধু সামরিক শক্তির প্রদর্শন নয়; এটি ছিল এক রাজনৈতিক বার্তা—চীন এখন বিশ্বশক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান পুনরায় ঘোষণা করছে।

