১৯৪৭ সালে পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার সময় হাতে গোনা কয়েকজন বাঙালি মুসলমান নৌবাহিনীর অফিসার ছিলেন। তাদের মধ্যে সিনিয়র মোস্ট ছিলেন তদানীন্তন কমান্ডার ( লে. কর্নেল) রশিদ। পরবর্তিতে তিনি ১৯৫৯ সালে কমডোর হিসাবে অবসর গ্রহণ করেন। তাঁর স্ত্রী সামস রশিদ ছিলেন বাংলা সাহিত্যের একজন প্রখ্যাত লেখিকা। সিন্ধু বারোয়া, উপল উপকুলে নামে তাঁর দুটি উল্লেখযোগ্য বই আছে। আমার সংগ্রহেও রয়েছে।
কয়েকদিন আগে হঠাৎ করেই একটি ফোরামে কমডোর রশিদের মেয়ে জনাবা শারমিন রশিদের দেখা পাই। তিনি তদানীন্তন সেনাপ্রধান জেনারেল আইয়ুব খানের সাথে তাঁর পিতার এই ছবিটি পোস্ট করেন।এর আগে বহু চেষ্টা করেও তাঁর কোন ছবি জোগাড় করতে পারিনি।
কমডোর রশিদ বাঙালি মুসলমানের মধ্যে জ্যেষ্ঠতম নৌ অফিসার ছিলেন বৃটিশ নৌবাহিনীতে। আমাদের ইতিহাসে এসব নেই। আমি আমার ডিফেন্স জার্নাল মারফত কিছু কাজ করেছি।পূর্ব পাকিস্তানী দের মধ্যে তিন বাহিনী মিলে সবচেয়ে সিনিয়র ছিলেন মেজর জেনারেল ইশফাকুল মজিদ। তিনি আইয়ুব খানেরও আগে বৃটেনের স্যান্ডহার্স্ট থেকে কমিশন লাভ করেন।
তবে বাঙালি তো বটেই পুরো উপমহাদেশে বৃটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর এক নম্বর অর্থাৎ আর্মি নম্বরে সিনিয়র মোস্ট ছিলেন মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা। ইনি পরে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হন। স্যান্ডহার্স্টে মির্জা ভালো করায় ভারতীয় সেনা অফিসারদের মধ্যে তার আর্মি নম্বর হয় ১! (এই উপমহাদেশে তিনি ‘এক নম্বর’ কমিশন্ড অফিসার)! তিনি ছিলেন মীরজাফরের সরাসরি বংশধর, মুর্শিদাবাদের লোক।
১৯৪৭ সালের ১৪ অগাষ্ট পর্যন্ত বৃটিশ ভারতীয় বিমানবাহিনীতে কোন বাঙালি মুসলমান জঙ্গি বিমান চালক ছিলেন না বলেই জানা যায়। অন্তত আমার পরিচিত কোন সিনিয়র অফিসার বলতে পারেননি। অন্যান্য অফিসার কয়েকজন, কারা ছিলেন তাও স্ষ্ট নয়। হিন্দু বাঙালিদের মধ্যে জঙ্গি বিমান চালক ছিলেন।
বৃটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে মাত্র জনা বিশেক বাঙালি মুসলমান সেনা অফিসার ছিলেন পূর্ব বঙ্গের। পদাতিক, সাপ্লাই, গোলন্দাজ ইত্যাদি বাহিনীর তদানীন্তন মেজর ওসমানী, ক্যাপ্টেন গনি, মেজর আফসার উদ্দিন এদের মধ্যে অন্যতম। তবে আরো কিছু ছিলেন ডাক্তার। সেই হিসাব আলাদা। সৈনিক কতোজন ছিলেন তা আর জানা যায় না। তবে তাদের সংখ্যাও ছিল অতি নগণ্য।
বৃটিশরা পূর্ব বঙ্গে কোন সামরিক স্কুল বা কলেজ তৈরি করেনি। সব তৈরি করে ভারত ও পাকিস্তানের এলাকায়।
বৃটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে একসময় একটিমাত্র বাঙালি পল্টন ছিল- ৪৯ বেঙলিস। কবি নজরুল এই পল্টনে ছিলেন। কিছু অপকর্মের কারনে বৃটিশরা এই পল্টন ভেঙে দেয়। পরে আর কখনোই আলাদা বাঙালি পল্টন তৈরি করেনি। অথচ ভারতের প্রতিটি জাতি যেমন পান্জাবী, রাজপুত, বালুচ, পাঠান, মারাঠা, শিখদের আলাদা রেজিমেন্ট ছিল যা এখনো ভারত ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে আছে। ভারত এখন পর্যন্ত তাদের সেনাবাহিনীতে বাঙালিদের জন্য কোন পৃথক রেজিমেন্ট গঠন করেনি।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে প্রথম নিজস্ব বা ইন্ডেজিনাস রেজিমেন্ট ছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট যা ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় গঠিত হয়। তখন পূর্ব পাকিস্তানের জিওসি ছিলেন মেজর জেনারেল আইয়ুব খান! জিন্নাহ সাহেব ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট উদ্বোধন করেন।
আইয়ুব খান ক্ষমতা গ্রহণের পর পূর্ব পাকিস্তানে প্রথমবারের মতো একটি ক্যাডেট কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় ফৌজদারহাটে। তাঁর আমলে আরো তিনটি ক্যাডেট কলেজসহ কয়েকটি রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল তৈরি হয়। জেনারেল জিয়াউর রহমান পরবর্তিতে ওই রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল গুলোকে ক্যাডেট কলেজে রূপান্তরের উদ্যোগ নেন।
লেখক: আবু রুশদ এআরএম শহীদুল ইসলাম

